৮ — ১৩ জিলহজ
হজ গাইড
পবিত্র হজের ধারাবাহিক করণীয়, ফরজ ও ওয়াজিব এবং জরুরি জ্ঞাতব্য — সহজ বাংলায়।
শুরু করুনদিনভিত্তিক করণীয়
৮ জিলহজ থেকে ১৩ জিলহজ — ধারাবাহিক হজ গাইড
৮ জিলহজ
ইহরাম ও মিনায় গমন
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে মক্কার হোটেল থেকে ইহরাম পরিধান করুন এবং দুই রাকাত সালাত আদায় করুন। নারীগণ পরিচ্ছন্ন হয়ে স্বাভাবিক কাপড় পরবেন।
‘লাব্বাইক্কা হাজ্জান’ বলে হজের নিয়ত করুন এবং তালবিয়া পাঠ করতে থাকুন। তালবিয়া পাঠ ১০ তারিখে পাথর নিক্ষেপের পূর্ব পর্যন্ত চলতে থাকবে।
لَبَّيْكَ حَجًّا
লাব্বাইক্কা হাজ্জান
“হে আল্লাহ, আমি হজের জন্য হাজির।” মিনায় জোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও পরদিন ফজর—এই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা সুন্নাহ।
৯ জিলহজ
আরাফার দিন ও মুযদালিফায় অবস্থান
সূর্যোদয়ের পর তালবিয়া ও তাকবির বলতে বলতে আরাফার দিকে রওয়ানা হোন।
আরাফায় জোহর-আসর একসাথে এক আজান ও দুই ইকামতে আদায় করার পর খুতবা শোনা সুন্নাহ।
জোহর-আসর আদায়ের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দোয়া করতে থাকুন। আরাফার দিনের দোয়া জীবনের শ্রেষ্ঠ দোয়া। আরাফার দিনের সর্বোত্তম দোয়া হলো:
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা-শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া ‘আলা কুল্লি শাইইন কাদীর
“আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই; রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই, আর তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।” এছাড়াও কুরআন-হাদিসে বর্ণিত দোয়া এবং যেকোনো কল্যাণকর চাওয়া আল্লাহর নিকট কায়মনোবাক্যে নিবেদন করতে থাকুন।
সূর্যাস্তের পর ভাবগাম্ভীর্যের সাথে আরাফা থেকে মুযদালিফায় রওয়ানা দিন। মুযদালিফায় এশার ওয়াক্ত হলে মাগরিব ও এশা এক আজান ও দুই ইকামত দিয়ে আদায় করে মুযদালিফায় রাতে বিশ্রাম করুন।
১০ জিলহজ
ঈদের দিন — কঙ্কর, কুরবানি, হলক ও তাওয়াফ
মুযদালিফায় আউয়াল ওয়াক্তে ফজরের সালাত আদায় করে আকাশ ফর্সা হওয়ার আগ পর্যন্ত দোয়া-জিকিরে মশগুল থাকা সুন্নাহ।
সূর্যোদয়ের পূর্বে মিনার দিকে রওয়ানা দিন। অবশ্য বৃদ্ধ-নারী বা বেশি অসুস্থ ব্যক্তি রাতের প্রথমার্ধের পরও মিনার দিকে রওয়ানা হতে পারেন।
ঈদের দিন বড় জামারায় নিক্ষেপের জন্য ৭টি কঙ্কর এবং পরবর্তী তিন দিনের জন্য ৬৩টি, মোট ৭০টি কঙ্কর মুযদালিফা থেকে নেওয়া যায়। মুযদালিফা থেকে নেওয়া জরুরি নয়; তবে এখানে কঙ্কর সহজে পাওয়া যায়।
সূর্যোদয়ের পর জোহরের আগে শুধু বড় জামারায় ‘আল্লাহু আকবার’ বলে বলে ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করুন। বড় জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপের আগ মুহূর্ত থেকেই তালবিয়া পাঠ বন্ধ করে দিতে হবে।
তামাত্তু ও কিরান হজকারী কঙ্কর নিক্ষেপের পর কুরবানি করবেন। অবশ্য ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়া থাকলে নিজে কুরবানি নিজে করার ব্যত্যয় নেই। আর ইফরাদ হজে কুরবানি নেই।
এরপর মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করুন। তারপর ইহরামমুক্ত হয়ে স্বাভাবিক পোশাক পরা যাবে।
মক্কায় এসে তাওয়াফ এবং সাঈ করুন। এরপর পরিপূর্ণভাবে ইহরামের বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন।
মিনায় রাত যাপন করুন।
১১ জিলহজ
তিন জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ
জোহরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর প্রথমে ছোট জামারায় ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করুন। এরপর কিছুদূর সামনে অগ্রসর হয়ে দীর্ঘ সময় দোয়া করুন। তারপর দ্বিতীয় জামারায় একইভাবে কঙ্কর নিক্ষেপের পর পূর্বের মতো দোয়া করুন। সর্বশেষ তৃতীয় ও বড় জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ করুন। কিন্তু সেখানে দোয়ার জন্য আর না দাঁড়িয়ে চলে আসতে হবে।
মিনায় রাত যাপন করুন।
১২ জিলহজ
কঙ্কর নিক্ষেপ ও মক্কায় প্রত্যাবর্তন
১২ জিলহজের করণীয় ১১ জিলহজের মতোই। তিন জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ এবং প্রথম দুই জামারায় দোয়া করা। এই দিন চাইলে মক্কায় চলে আসা যাবে, তবে সেক্ষেত্রে সূর্যাস্তের আগেই মিনা ত্যাগ করতে হবে। আর সূর্যাস্তের পরও মিনায় অবস্থান করলে রাত যাপন করে পরদিন জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে।
১৩ জিলহজ
সর্বশেষ কঙ্কর নিক্ষেপ
১৩ জিলহজের কাজও ১১ ও ১২ জিলহজের কাজের মতোই। তিন জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা এবং প্রথম দুই জামারায় নিক্ষেপের পর দোয়া করা।
এরপর মক্কায় ফিরে যাওয়া।
হজের সর্বশেষ কাজ
মক্কায় ফিরে আসার পর স্বাভাবিকভাবে হারামে ইবাদত-বন্দেগিতে মগ্ন থাকুন। এরপর মক্কা ত্যাগের শেষ মুহূর্তে সর্বশেষ আমল হিসেবে বিদায়ী তাওয়াফ করুন। এই তাওয়াফের পর সাঈ করতে হবে না।
হজের ফজিলত
যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য হজ করল এবং জৈবিক চাহিদা সংশ্লিষ্ট অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত থাকল, সে সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসবে।
— বুখারি: ১৫২১; মুসলিম: ১৩৫০
হজের ফরজ
- ১.ইহরাম পরিধান করা।
- ২.আরাফায় অবস্থান করা।
- ৩.তাওয়াফে ইফাদা করা। (হানাফী মতানুযায়ী সাঈ করা ওয়াজিব, তবে অন্যান্য ইমামদের মতে সাঈ করাও ফরজ।)
হজের ওয়াজিব
- ১.মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা।
- ২.সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করা।
- ৩.মুযদালিফায় রাত যাপন করা।
- ৪.জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা।
- ৫.মাথা মুণ্ডন করা বা চুল ছোট করা।
- ৬.কিরান ও তামাত্তু হজে কুরবানি করা।
- ৭.বিদায়ী তাওয়াফ করা।
- ৮.ঈদের দিনে জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপের পর কুরবানি ও মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করায় ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হানাফি, মালেকি এবং এক বর্ণনা অনুযায়ী হাম্বলি মতে ওয়াজিব। শাফেয়ী এবং হাম্বলির অপর বর্ণনা অনুযায়ী সুন্নাহ।
- ৯.তাশরিকের রাতগুলো মিনায় যাপন করা হানাফি মতে সুন্নাহ। অন্য তিন ইমামের মতে ওয়াজিব।
- ১০.ফরজ ও ওয়াজিবের বাইরে উল্লিখিত অন্য কাজগুলো করা সুন্নাহ।
- ১১.ফরজ ছুটে গেলে হজ বাতিল হয়ে যাবে। ওয়াজিব ছুটে গেলে হজ বাতিল হবে না, তবে দম দিতে হবে। আর সুন্নাহ ছুটে গেলে দম দিতে হবে না — হজ আদায় হয়ে যাবে, তবে সুন্নাহ তরকের কারণে কিছুটা ত্রুটিপূর্ণ হলো।
জরুরি জ্ঞাতব্য
- ১.৮ জিলহজ মক্কায় ইহরাম পরা তামাত্তু হজকারীর জন্য প্রযোজ্য। কিরান ও ইফরাদকারী আগে থেকেই ইহরামরত থাকবেন।
- ২.হজের দিনগুলোতে অধিক পরিমাণে তাকবীর, যিকর ও দোয়ায় মশগুল থাকতে হবে।
- ৩.ঈদের দিন বড় জামারায় সূর্যোদয়ের পর থেকে জোহরের ওয়াক্ত হওয়া পর্যন্ত এবং পরবর্তী দিনগুলোতে জোহরের ওয়াক্ত হওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে।
- ৪.৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত সব ফরজ সালাত শেষে তাকবীরে তাশরীক পাঠ করতে হবে।
- ৫.তাশরীকের দিনগুলোকে হাদীসে যিকর, তাকবীর ও খাওয়া-দাওয়ার দিন বলে অভিহিত করা হয়েছে।
ইহরামের নিষিদ্ধ কাজসমূহ
জৈবিক চাহিদা সংশ্লিষ্ট কাজ করা, ঝগড়া-বিবাদ করা, শিকার করা, পুরুষদের জন্য সেলাইযুক্ত কাপড় পরা, মাথা বা চেহারা ঢেকে রাখা, সুগন্ধি ব্যবহার, চুল বা নখ কাটা।